জঙ্গি ও জঙ্গিবাদ দমনে জামায়াতে ইসলামী অতীতেও ভূমিকা পালন করেছে এখনও করছে

জঙ্গি ও জঙ্গিবাদ দমনে জামায়াতে ইসলামী অতীতেও ভূমিকা পালন করেছে এখনও করছে

গত ৩ আগস্ট আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী নেতা দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ বলেছেন, “জঙ্গিবাদ দমনে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকেও ভূমিকা পালন করতে হবে।” আমি প্রথমেই জনাব কাজী জাফর উল্লাহকে জনতার পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই তার এ ধরনের ইতিবাচক বক্তব্যের জন্য।

জামায়াতে ইসলামীর একজন সদস্য হিসেবে পরিষ্কার বলতে চাই, অতীতে যেকোন জাতীয় দূর্যোগে জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত জোরালো ভূমিকা পালন করেছিলো, ইতিহাস যার সাক্ষী। বাংলাদেশের যেকোন আন্দোলন ও সংকটে রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে মিলেমিশে একত্রে ঝাপিয়ে পড়ার দৃষ্টান্ত ইতিহাসের পাতায় সমুজ্জ্বল। কিন্তু বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার যেকোন কারণেই অতীতের সেই রাজনৈতিক কালচার ও ঐতিহ্যকে ভূলণ্ঠিত করে সম্পূর্ণ উল্টো পথে চলছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে এক অস্থির সময় অতিবাহিত করছে। দেশে চাঁদাবাজি, রাহাজানি, টে-ারবাজি, খুন, গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যা, দুর্নীতির মহোৎসব, লুটপাট ও উগ্র তৎপরতা বিরামহীনভাবে চলছে। মানুষের বাক স্বাধীনতা ও ভোটের অধিকার হরণ করে অনৈতিকভাবে ক্ষমতা দখল করে একদলীয় স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা, ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যসহ নানা অনাচার-অবিচারের কারণে মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনাগুলোই যেন আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। অপরাজনীতির কারণে আমাদের জাতিসত্ত্বা এখন মারাত্মক হুমকির মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতা অর্জিত হলেও প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক আদর্শ ও রীতিনীতি এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দেশের মানুষ এখনো গণতন্ত্র ও তাদের ভোটাধিকারের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর গেল ৪৫ বছরে বাংলাদেশে এখন যে জননিরাপত্তার সংকট তৈরি হয়েছে, এতটা বিপর্যয়ের মধ্যে দেশ আগে কখনো পড়েনি।

গণতন্ত্র, সাম্য, ইনসাফ ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মূল মন্ত্রকে সামনে রেখে, যে বুক ভরা আশা নিয়ে দেশের মানুষ একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, সচেতন মানুষের মুখে-মুখে আজ একটিই প্রশ্ন- সে উদ্দেশ্য পূরণে আমরা কতটুকু সফল হয়েছি?
আওয়ামীলীগ অতীতে জামায়াতে ইসলামী সহ অন্যান্য দলের সাথে একত্রে যুগপৎ কর্মসূচি পালন করেছে, সরকার গঠনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের সহযোগিতা চেয়েছে অথচ তারাই আজকে বেমালুম ভুলে গিয়েছে যে, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। একটি বিরাট সংখ্যক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে এ দলটি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তার যাত্রা শুরুর পর থেকে সকল দলের অংশগ্রহণে স্থানীয় থেকে জাতীয় সকল নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেছে। আমরা যদি ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটকে জামায়াতের জনসমর্থনের মাপকাঠি হিসেবেও বিবেচনা করি তাতেও সে নির্বাচনে এককভাবে এক-তৃতীয়াংশেরও কম আসনে নির্বাচন করে জামায়াত ভোট পেয়েছিলো প্রায় ১২% এর উপরে। বর্তমানে তো সেটা আরো অনেক বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। যা এই সরকারের ভোট চুরির মহা ধুমধামের মধ্যেও তাদের অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াতের প্রাপ্ত ভোট থেকেও পরিষ্কার। এ ধরনের একটি দলকে বাদ দিয়ে যারা জাতীয় ঐক্যের কথা বলে, তারা আসলে জাতীয় ঐক্যের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে।

দেরিতে হলেও জনাব কাজী জাফর উল্লাহ সাহস করে যে সত্য বক্তব্য প্রদান করেছেন, তার জন্য আবারো জনতার পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ জানাই। কিছুদিন পূর্বে সম্মানিত জেলা প্রশাসকদের সম্মেলন শেষে আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব সৈয়দ আশরাফও বলেছিলেন, প্রশাসনিক উদ্যোগে জঙ্গিবাদ বিরোধী যেসব কমিটি হবে, সেগুলো দলীয় হবে না। জামায়াতে ইসলামী সহ সকল দলের প্রতিনিধিদেরকে নিয়েই তা করা হবে। আওয়ামীলীগের এই দুই নেতার বক্তব্য তাদের একান্তই ব্যক্তিগত না দল ও সরকারেরই এই বক্তব্য তা আমরা জানি না। নিজের হোক বা দলের হোক উভয় ক্ষেত্রে বিষয়টি জাতীয় জীবনের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি ইঙ্গিত বহন করে।

আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই, জামায়াতে ইসলামীর উদ্দেশ্যে জনাব কাজী জাফর উল্লাহ যে বক্তব্য দিয়েছেন, আমরা এই দায়িত্ব পালনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে জনাব কাজী জাফর উল্লাহ তার দল এবং সরকারকে এ দায়িত্ব পালনে তাদের পক্ষ থেকে যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে, সবার আগে সেটি দূর করতে হবে। জামায়াত নেতৃবৃন্দ এবং তার কর্মীদেরকে সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার অর্থাৎ বাক স্বাধীনতা, চলা ফেরার স্বাধীনতা, সভা-সমাবেশ ও বক্তব্য প্রদানের সুযোগ সহ সারাদেশে বন্ধ করে দেয়া অফিসগুলোকে অবিলম্বে খুলে দিতে হবে। জঙ্গি দমনের নামে সারাদেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত অভিযানের মাধ্যমে হাজার-হাজার জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী ও সাধারণ জনগণকে হয়রানির ও প্রেফতার চালিয়ে আর যাই হোক জঙ্গি দমন করা সম্ভব নয়। পর্যাপ্ত হোম ওয়ার্ক ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সুনিশ্চিত হয়ে সুনির্দিষ্ঠভাবে অভিযান পরিচালনা না করে এভাবে যত্রতত্র অভিযান বন্ধ করা উচিত। এর মাধ্যমে মূলত জঙ্গিরাই আশকারা পাবে এবং এটা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জনতার মুখোমুখি দাড় করাবে যা মোটেই কাম্য নয়।

না! আশার আলো একেবারেই নিভে যায়নি। কিঞ্চিৎ হলেও মিটি-মিটি আশোর আলো জ্বলে উঠেছে আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের বক্তব্যের মাধ্যমে। বাংলাদেশের মানুষ যখন চরম আতঙ্কে সময় অতিবাহিত করছেন, এবং দেশ যখন এক অনিশ্চিত গন্তব্যের পানে ছুটে চলেছে, দেশের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের পক্ষ থেকে উদ্ভুত সমস্যা মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হচ্ছে। ঠিক তখনও দেশ পরিচালনার দায়িত্বে যারা জোর করে গ্রহণ করেছেন, সেই সরকারী দলের নেতৃত্বের একটি বড় অংশ ও তাদের বাম দোসর জাসদ ইনু ও সিপিবির মতো কট্টর বামপন্থী দলের গণবিচ্ছিন্ন বক্তৃতা নির্ভর কিছু নেতা জামায়াতকে নিয়ে কোন জাতীয় ঐক্য হবে না মর্মে যেভাবে কোরাস গেয়ে চলছিলেন, সৈয়দ আশরাফ ও কাজী জাফর উল্লাহর বক্তব্যে কিছুটা হলেও জাতি আশার আলো খুঁজে পাচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য সরকারী দল ও তার বাম দোসরগণ আদর্শিক শত্রুতা ও রাজনৈতিক কৌশলের কারণে এমন বক্তব্য দিতে পারে, বাংলাদেশের চলমান অপরাজনীতির ধারায় এটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু দু’এক জন সম্মানিত ডানপন্থি বুদ্ধিজীবি জাতীয় ঐক্যের খণ্ডিত রূপ নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, আমি তাদের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে বিনীতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, জাতীয় ঐক্যের নামে জামায়াতকে বাদ দিয়ে যাদের সাথে বিএনপির ঐক্য করিয়ে দিতে চান, তারা নিজেরা বহুবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করেও সফল হননি। আর বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ঐ কয়েকটি দল একত্রিত হলেই কি জাতীয় ঐক্য হয়ে যাবে? তাহলে তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ১৪ দলকে নিয়ে যে জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা দিলেন, এটা কি তারই অনুরূপ হয়ে গেলো না? প্রধানমন্ত্রী ১৪ দলকে নিয়ে ঘোষণা করেছেন একটি জাতীয় ঐক্যের? বেগম জিয়া ৪/৫ টি দলকে নিয়ে ঘোষণা করবেন আরেকটি জাতীয় ঐক্যের? জামায়াতে ইসলামী জনগণকে সাথে নিয়ে ঘোষণা দিবে আরেকটি জাতীয় ঐক্যের? ২০ দলের বাকী দলগুলো চেষ্টা করবে তাদের মতো করে জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা দিতে। দেশের আলেম-ওলামাগণ মিলে যদি ঘোষণা করেন আমরা আলেমরা মিলে একটি জাতীয় ঐক্য? তাহলে জাতীয় ঐক্যের নামে ঐক্য হলো? না জাতিকে বহুধাবিভক্ত করা হলো? আর এই বিষয়গুলো গভীর বিশ্লেষণ ও চিন্তা-ভাবনা করার জন্য সম্মানিত বুদ্ধিজীবিদেরকে বিনীত আহবান জানাচ্ছি। একই সাথে বিএনপি-জামায়াতকে আলাদা করার পরিণতি সম্পর্কে বিশেষভাবে ভাববার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। দৈনিক যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জনাব সাইফুল ইসলাম একটি বেসরকারী টেলিভিশনে সংবাদপত্রের মতামত পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে বলেছেন, “জাতীয় ঐক্যের নামে জামায়াতকে যদি একবার আলাদা করা হয় সেই জামায়াত নির্বাচনের সময় বিএনপির সাথে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসবে এর কি কোন নিশ্চয়তা আছে?”

জনাব কাজী জাফর উল্লাহ জাতীয় সমস্যার সমাধানে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সকলকে ভূমিকা পালনের কথা বলেছেন। আমি মনে করি তিনি যথার্থভাবেই দেশবাসীর মনের কথাই বলেছেন। সেজন্য তিনি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে তিনি একই সাথে বলেছেন, জামায়াতের ভিতর থেকে একটি গ্রুপ জঙ্গিদেরকে মদদ দিচ্ছে। তারই এ কথার সাথে আমরা সবিনয় দ্বিমত পোষণ করছি। জামায়াতের ভিতর থেকে জঙ্গিদেরকে মদদ দিতে পারে এমন কোন গ্রুপের অস্তিত্ব জামায়াতের ভিতরে থাকার প্রশ্নই উঠে না। কারণ জামায়াতে ইসলামীতে দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা পুরোপুরি বিদ্যমান। ইউনিট থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সকল স্তরের নেতৃত্ব সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। আলাদা গ্রুপ সৃষ্টির কোন সুযোগ জামায়াতে ইসলামীতে নেই। আর সেরকম কোন খারাপ উদাহরণ থেকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর মেহেরবাণি দিয়ে আমাদেরকে সম্পূর্ণরুপে হেফাজত করেছেন।

জামায়াত প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই নিয়মতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক পদ্ধতিতে তার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। জামায়াতের গঠনতন্ত্রে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে জামায়াত যে ধরনের কর্মনীতি অনুসরণ করবে তার সুস্পষ্ট ঘোষণা প্রদান করা হয়েছে। জামায়াতের কর্মনীতির দ্বিতীয় ধারায় বলা হয়েছে, “উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হাসিলের জন্য জামায়াত এমন কোন পন্থ অবলম্বন করিবে না যাহা সততা ও বিশ্বাসপরায়ণতার পরিপন্থি এবং যার ফলে সমাজে ফিতনা ফাসাদ (বিপর্যয়) বৃদ্ধি পায়।” জন্মলগ্ন থেকে জামায়াত এই নিয়মনীতির উপর অটল-অবিচল, আস্থা রেখেই তার পথচলা অব্যাহত রেখেছে।

জনাব কাজী জাফর উল্লাহ সাহেবকে বিনীতিভাবে অনুরোধ জানাবো, আপনাদের হাতে এখন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা, এমন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা বাংলাদেশের ইতিহাসে তো দূরে থাক পৃথিবীর কোন স্বৈরশাসক ভোগ করেছেন কিনা তা আমার জানা নেই। মেহেরবাণি করে আপনাদের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আপনি কিংবা আপনার দল আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে দেখতে পারেন। জামায়াতের কোন নেতা তো দূরে থাক একজন সমর্থকের সাথে ও জঙ্গিবাদীদের কোন সম্পর্ক আবিষ্কার করতে পারেন কিনা? আমার দৃঢ় বিশ্বাস পূর্ব ধারণা থেকে মুক্ত হয়ে সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা নিয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে যদি অনুসন্ধান করেন, তাহলে আসল চিত্র আপনাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। জামায়াতে ইসলামী মনে প্রাণে উগ্রপন্থাকে ঘৃণা করে। সেজন্য জামায়াত নিয়মিত মোটিভেশনের মধ্যেই তার সমর্থক ও জনশক্তিকে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হাসিলের জন্য বৈজ্ঞানিক পন্থায় দাওয়াত, চরিত্র গঠন ও একজন নিষ্ঠাবান দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি সঠিক ও মধ্যপন্থার মাধ্যমে তার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অতএব অন্ধকারে কাঁচের ঘরে ঢিল মেরে লাভ হবে না।

জনাব কাজী জাফর উল্লাহ সাহেব ও তার দল আওয়ামীলীগকে সবিনয়ে আহবান জানাবো, একটুখানি সাহস করে যখন শর্ত সাপেক্ষে হলেও জামায়াত-বিএনপির সাথে ঐক্যের সদিচ্ছা ব্যক্ত করেছেন অতএব আরো একটু অগ্রসর হয়ে আরো একটু সদিচ্ছা নিয়ে দলীয় চিন্তার উর্ধ্বে উঠে কোন প্রকার শর্ত ছাড়াই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেন, তাহলে আর একবার গণতন্ত্রের কণ্ঠস্বর হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ন্যায় গোটা জাতিকে আপনাদের পাশে পাবেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আপনাদের এরকম শর্তহীন আহবানে আপনাদের পাশে জামায়াতে ইসলামীও দৃঢ়ভাবে সহযোগিতা করবে। যার ফলাফল দেশ জাতি তো পাবেই দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন আপনারাই। বিগত বছরগুলোতে আপনাদের ভুল কর্মকৌশলের কারণে গোটা জাতির মধ্যে যে বিভেদ ও বিচ্ছেদ তৈরি হয়েছে তা কেটে যাবে। জঙ্গিবাদ নির্মূলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর খুব একটা প্রয়োজন হবে না। এরকম একটি ঐক্যবদ্ধ ঘোষণাই জঙ্গিবাদকে নির্মূলে মাইলফলকের ভূমিকা পালন করবে এবং জঙ্গিরা বাংলাদেশের কোথাও কোন আশ্রয় খুঁজে পাবে না।

সুতরাং সবার আগে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে সকল পারিপার্শ্বিকতার উর্ধ্বে উঠে দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নি:শর্তভাবে সকলকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিন। দেখুন পরিস্থিতির পরিবর্তন কতটা দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হয়। আর তা যদি না করে শর্তের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে ব্লেম গেইম অব্যাহত রেখে জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত রাখার ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন তাহলে ইতিহাসই আপনাদের কর্মকা-ের সঠিক মূল্যায়ন ও বিচার করবে।

বাংলাদেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিশেষ করে সেক্যুলার ও বাম ধারার রাজনৈতিক দল ও কতিপয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও কর্মীর পরমত সহিষ্ণুতার অভাবের কারণে শান্তিপ্রিয় এই জাতি আজকে দ্বিধা দ্বন্দ, কলহ ও অশান্তির মধ্যে নিপতিত হয়েছে। পরমত সহিষ্ণুতা বলতে অন্যের মত সহ্য করা বুঝায়। মানব সমাজ বহু মত ও পথের অপূর্ব সম্মিলন। জন্মগতভাবে মানুষ তার নিজস্ব বিশ্বাস লালন এবং সে আলোকে জীবন-যাপনের অধিকার রাখে। যদি তার এই বিশ্বাস ও কাজ সমাজের অন্য লোকদের ক্ষতি না করে তাহলে কারও অধিকার নেই জোর প্রয়োগ করে ব্যক্তির নিজস্ব স্বাধীন এই জীবন ধারায় হস্তক্ষেপ করা। পরমত সহিষ্ণুতা হলো, ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে অন্যের মত প্রকাশের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। নিজের মতের সাথে না মিললেও অন্যের মত প্রকাশের অধিকারকে শক্তি বা প্রভাব দিয়ে রুদ্ধ না করা। কিন্তু আজকে আমাদের দেশে কিছু বাম দল, মিডিয়ায় কর্মরত তাদের গুটি কতেক দোসরদের টকশো কিংবা গোলটেবিল বৈঠকের বক্তব্য শুনলে মনে হবে, তারাই হচ্ছেন সবজান্তা। তারা এমন হাবভাব প্রকাশ করেন যাতে মনে হয় এই কয়েকজনই বুঝি বাংলাদেশের মালিক মুক্তার। বাকীরা সব তাদের রায়ৎ বা প্রজা। এ ধরনের গুটি কতেক স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিদের হিং¯্র ছোঁবলে বাংলাদেশ আজ ক্ষত-বিক্ষত। মুষ্টিমেয় চিন্হিত এই গুষ্টিটি ছাড়া বাংলাদেশের সকল দলের মানুষ এবং সামাজিক শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ এবং তারা পরমত সহিষ্ণুতায় গভীরভাবে বিশ্বাসী।

অতএব দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণে সকল হিংসা-বিদ্বেষ, দলাদলি ও কোন্দল পরিহার করে বিশেষ করে জনগণের মধ্যে নানা বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য, মিথ্যা অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে জনাব ইনু-মেনন সাহেব ও সিপিবি মার্কা মুষ্টিমেয় জনবিচ্ছিন্ন দল ও ব্যক্তিদের পাল্লায় পড়ে জাতির বৃহত্তর মানুষের আশা আকাঙ্খাকে পদদলিত করা কারো জন্য কাম্য হতে পারে না। সুতরাং আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ ও প্রভাবশালী নেতা কাজী জাফর উল্লাহ জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে যে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন, তার মাধ্যমে জাতির বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আকাঙ্খারই প্রতিফলন ঘটেছে।

দেশবাসীর প্রত্যাশা, বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল পরমত সহিষ্ণুতার চর্চাকে আরো বিকশিত করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষকে অন্তর্ভূক্ত করে ইস্পাত কঠিন জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সকলেই যার যার জায়গা থেকে আরো এগিয়ে আসবেন। এখানেই চলমান জাতীয় দূর্যোগের সমাধান নিহিত।

লেখকঃ কেন্দ্রিয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত লেখাটির লিঙ্ক