আমার দেখা শ্রেষ্ঠ জানাযা

আমার দেখা শ্রেষ্ঠ জানাযা

২৩ অক্টোবর ২০১৪ প্রকৃত সময়টি পুরোপুরি স্মরণে আসছেনা। দিনের বেলা আনুমানিক ১২টা বা ১২.৩০টা হবে। শহীদি কাফেলার প্রাক্তন কেন্দ্রিয় সভাপতি, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রিয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য শ্রদ্ধাভাজন ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের ভাইকে ফোন করেছি কোন একটা কাজে। তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, প্রফেসর সাহেবের সর্বশেষ অবস্থা জানি কিনা। তাঁর মুখ থেকেই স্যারের স্বাস্থ্যের সর্বশেষ অবস্থা অবগত হলাম। সেই থেকে প্রতিটি মুহুর্ত কেমন একটা উদ্বেগ-উৎকন্ঠার মধ্যে অতিবাহিত হচ্ছিল। এরই মধ্যে মহানগরী অফিস থেকে ফোন করে জানানো হলো সন্ধ্যা ৬ টায় জরুরী বৈঠক আহবান করা হয়েছে। বুঝতে বাকী রইলনা স্যারের অবস্থা যে আরো অবনতিশীল। ততক্ষণে মিডিয়ার মাধ্যমে জানা গেল স্যারকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।

সন্ধ্যার মিটিংয়ে যথারীতি অংশগ্রহণ করলাম। সিটি আমীর শ্রদ্ধাভাজন মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান আমাদের সাথে পরামর্শ করে কতিপয় দিক-নির্দেশনা প্রদান করলেন। মিটিং শেষে সালাতুল এশা আদায় করে বাসায় ফিরতে রাত ৯ টা বেজে গেল। সে সময় ফোন করলেন জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী জেনারেল জনাব ডা. শফিকুর রহমান। তিনি সার্বিক অবস্থা তুলে ধরে কিছু পরামর্শ প্রদান করলেন এবং স্যারের সর্বশেষ অবস্থা ও পিজি হাসপাতালের সে সময়ের পরিবেশ জানাতে বললেন। ততক্ষণে একুশে টিভির স্ক্রলিং এ অধ্যাপক গোলাম আযমের ইন্তেকালের সংবাদ প্রচার হচ্ছিল। যদিও এ সংবাদ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা পরিবারের কারো দ্বারা সমর্থিত ছিল না। আমি মুহতারাম সেক্রেটারী জেনারেলকে তাৎক্ষণিকভাবে আমি যতটুকু জানি তা অবগত করলাম এবং আরো খবর নিয়ে পরবর্তীতে পুরো বিষয়টি অবহিত করতে পারব বলে জানালাম। আমি স্যারের ফ্যামিলি মেম্বার দু’জন অর্থাৎ তাঁর চতুর্থ ছেলে সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জনাব আব্দুল্লাহিল আমান আল আযমী, আমান ভাইয়ের স্ত্রী ও কাজী অফিস মসজিদের মুয়াজ্জিন জনাব রেজাউল করিম, এই তিন জনের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছিলাম। উনারা তখনও ইন্তেকালের খবর নিশ্চিত ছিলেন না। রাত ১০ টায় আমান ভাইকে আবারো ফোন দিলাম। তিনি আমাকে জানালেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু তারা আমাদেরকে কিছুই জানাচ্ছে না। বিষয়টি জানানোর জন্য আমি মুহতারাম ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী জেনারেলকে ফোন করলাম। তাঁকে সর্বশেষ অবস্থা জানিয়ে আমার মত ব্যক্ত করলাম এভাবে, অর্থাৎ স্যার সম্ভবত আমাদের মায়া ত্যাগ করে নিরবে চলে গেছেন আল্লাহর সানিধ্যে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরকারী নির্দেশ ও কোন কৌশলী অবস্থানের কারণে বিষয়টি ফ্যামিলি ও মিডিয়াকে এখনও অবহিত করছেনা বলে মনে হচ্ছে। তিনিও বিষয়টি সেভাবে ভাবছেন বলে মনে হল। ততক্ষনে স্যারের চলে যাওয়ার সংবাদটি সামাজিক মিডিয়ায় মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অধ্যাপক গোলাম আযমের আত্নীয়-স্বজন, ভক্ত-অনুরক্ত ও ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা পি.জি হাসপাতালমুখী যাত্রা শুরু করেন। মুহুর্তের মধ্যে শাহবাগ, পিজি হাসপাতালের ভেতর ও আশ-পাশের এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। মোতায়েন করা হয় বিপুল সংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। তারা পিজি’র গেটে চেকপোস্ট বসিয়ে আগত নেতা-কর্মী, আত্নীয়-স্বজন ও সাধারণ মানুষকে ভেতরে যেতে বাধা প্রদান করে। কিন্তু অধ্যাপক গোলাম আযমের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কাছে কৃত্রিম ভাবে গড়ে উঠা বালির বাঁধ ভেঙে জনতা ভেতরে প্রবেশ করে। স্যার রাত ১০টা ১০ মিনিটে ইন্তেকাল করলেও পিজি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ রাত ১১.৫৫ টায় আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেন। হাসপাতালের পরিচালক যখন অধ্যাপক গোলাম আযমের ইন্তেকালের ঘোষণা দেন, তার হাব-ভাব অঙ্গভঙ্গি দেখে মনে হয়েছে তখনও তার পক্ষে অনুভব করা সম্ভব হয়নি তিনি কোন ব্যক্তির মৃত্যুর সংবাদ দিচ্ছেন। তিনি অবশ্য তার ঘোষণায় উল্লেখ করেছেন অধ্যাপক গোলাম আযম কয়েদি হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছেন। তার পক্ষে এর চেয়ে বেশি কিছু বলার সুযোগ ছিলনা। কেননা তিনি গোলাম আযমকে একজন হাজতি-কয়েদি হিসেবে জেনেছেন ও দেখেছেন। তিনি আসল গোলাম আযমকে জানা, চেনা ও বুঝার জন্য কোন সময় ব্যয় করেননি, প্রয়োজনও হয়তোবা অনুভব করেননি। যদিও তার তত্ত্ববধানেই এই মহামনীষি ১০৪০ দিন সময় অতিবাহিত করেছেন। তিনি যদি প্রকৃত গোলাম আযমকে জানতেন, চিনতেন ও বুঝতে পারতেন নিঃসন্দেহে তিনি শুধু একজন গোলাম আযমের সাথেই পরিচিত হতেন না বরং তিনি হয়ে যেতে পারতেন সত্য পথের একজন পথিকও বটে। তবে তার ঘোষনার সাথে সাথে হাসপাতাল প্রাঙ্গনে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সবাই সম্বস্বরে বলে উঠেন “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” আমার ধারণা হাসপাতালের পরিচালক বিলম্বে হলেও কিছুটা বুঝতে পেরেছিলেন, যার ফলে তার পূর্বের অঙ্গ-ভঙ্গি ও ভাষার প্রয়োগে পরবর্তীতে কিছুটা পরিবর্তন হয়। ঘোষনার শেষ দিকে তিনি গোলাম আযম সাহেব ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে তার ঘোষণায় সমাপ্তি টানেন। যদিও হাসপাতালের সম্মানিত পরিচালক তার ঘোষণায় অধ্যাপক গোলাম আযমকে একজন কয়েদি হিসেবে ইন্তেকাল করেছেন বলে উল্লেখ করেন। বাহ্যত ও আইনগত ভাবে বিষয়টি হয়তো তাই। কিন্তু প্রকৃত অর্থে গোলাম আযম কয়েদি হিসেবে নয় বরং তিনি জালিমের কারাগারে নির্যাতিত অবস্থায় আল্লাহর দরবারে মকবুল শহীদ হিসেবে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। হাদীসে উল্লেখ রয়েছে- “কোন ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় কাজ রত অবস্থায় জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেও মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে শহীদের মর্যাদা দান করেন।” আল্লাহর এই মর্দে মুজাহিদ তাঁর সারাটি জীবন দ্বীনে হক্বকে বিজয়ী করার জন্য বিরামহীন সংগ্রাম করেছেন। কোন অবস্থায়ই মাথা নত করেননি। করেননি বাতিলের সাথে আপোষও। তিনি ছিলেন সাচ্চা দেশপ্রেমিক। দেশ ও দেশের জনগণের কল্যাণে গভীরভাবে ভাবতেন।

১৯৯২ সালে ঘাদানিকদের অন্যায় চাপের মুখে বিএনপি সরকার (জামায়াতে ইসলামী যে সরকারকে নিঃশর্ত সমর্থন প্রদান করেছিল) কর্তৃক গ্রেফতার, সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি লাভের পর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেইটে প্রথম উন্মুক্ত জনসভায় যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তা এখনও আমার কানে বাজে। তিনি বলেছিলেন, আমার জীবনের আর কোন চাওয়া পাওয়া নেই। আমি ভাবছি আমার দেশ ও জাতিকে নিয়ে। আমার দেশের মানুষকে আমি কোন অবস্থায় রেখে যাব। মানুষ জীবন সায়ানহে ভাবে তার সব চাইতে নিকট জনকে নিয়ে। অর্থাৎ সন্তান-সন্ততি, আত্নীয়-পরিজনের ভবিষ্যত নিয়ে। অধ্যাপক গোলাম আযমের সে রকম আত্নীয়-পরিজন নেই বিষয়টি তা নয়। বরং তার মন ও দিলটা ছিল আকাশের মত উদার। তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক মাপের নেতা। সে জন্য বৃহত্তর দেশ ও জনগণকে তার পরিবারের সদস্য ভাবতেন। তাইতো দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি ছিলেন উদ্ভিগ্ন। তারা প্রতিপক্ষরা সারাটা জীবন তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করেছে। অপবাদ, মিথ্যাচার, কূটুক্তি, গালিগালাজ থেকে শুরু করে এমন কোন হেন আচরণ তাঁর ব্যাপারে বাদ দেয়নি। জবাবে তাঁকে কখনও কারো ব্যাপারে কোন বিরুপ মন্তব্য করতে কেউ শোনেননি। ওদের ঐ খেস্তি-খেওড়ের দিকে নজর দেয়ার মতো কোন ফুরসত তাঁর ছিলনা। তিনি ব্যস্ত ও বিভোর থাকতেন দেশ ও মানুষের কল্যাণ চিন্তা নিয়ে। কিভাবে দেশ থেকে সংঘাত-সংঘর্ষের পরিবর্তে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশ ও জাতিকে সামনে অগ্রসর করা যায় সেই চিন্তায় অনেক সময় দিতে হয়েছে তাঁকে। ক্ষমতাসীনদের অধীনে নির্বাচন করলে দেশের নাগরিকরা তাদের ভোট পছন্দের প্রার্থীকে দিতে পারেনা। ভোট হয়তো দিল একটি মার্কার একজন প্রার্থীকে। কিন্তু বিজয়ী হয়ে গেলো যাকে সে ভোট দেয়নি অন্য মার্কার আরেকজন লোক। ফলে কালো টাকার মালিক ও পেশিশক্তির অধিকারী ব্যক্তিরা নির্বাচিত হয়ে দেশ শাসনের নামে দূর্নীতি, লুটতরাজ ও জনগণকে শোষণ করে তাদের অবৈধ শাসনকে প্রলম্বিত করার ফন্দি ফিকিরে ব্যস্ত থাকে। এর মোকাবেলায় গোটা জাতি যখন দিশেহারা, তখন বাংলাদেশের গণমানুষের মহান বন্ধু অধ্যাপক গোলাম আযম জাতিকে এই হতাশার হাত থেকে উদ্ধার করে তাদের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রণয়ন করলেন কেয়ারটেকার সরকারের রূপরেখা। যা ছিল পৃথিবীর নির্বাচনের ইতিহাসে একটি ইউনিক মডেল। প্রথমে অনেকেই এটা বুঝার ক্ষমতাও রাখেননি। কিন্তু পরবর্তীতে জনগণের মধ্যে যখন এই মডেল

ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে, তখন তৎকালীন প্রধান বিরোধীদল বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ এই রুপরেখার ভিত্তিতে জামায়াতের সাথে ঐক্যব্ধ আন্দোলন করার প্রস্তাব দেয়। যেহেতু জামায়াতের তৎকালীন আমীর, ভাষা সৈনিক, অধ্যাপক গোলাম আযমের উদ্ভাবিত কেয়ারটেকার এর প্রস্তাব মেনে নিয়ে এ দাবি আদায়ে জামায়াতের সাথে আওয়ামীলীগ ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনের প্রস্তাব করে, সংগত কারণেই জামায়াতও তাদের যুগপৎ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রস্তাবে সাড়া দেয়ার সিদ্ধান্তে উপনিত হয়।

কেয়ারটেকারের রূপরেখার ভিত্তিতে আন্দোলন করে সফলতা অর্জন করে দীর্ঘ ২১ বছর পর আবার ক্ষমতার স্বাদ লাভ করলো আওয়ামীলীগ। ৯৬-২০০১ তাদের ক্ষমতার এ সময়টিতে তারা এতো ফুরফুরে মেজাজে ছিল যে, সে সময় অধ্যাপক গোলাম আযম কিংবা জামায়াতে ইসলামীকে রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী বা অন্য কোন অভিধারায় অভিহিত করে বিচার করার কথা মনেও ছিলনা। কারণ সে সময় ক্ষমতা লাভের আগে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জামায়াতের সাথে ওঠা বসার প্রেক্ষিতে আমার মনে হয় তাদের চিন্তা-চেতনায় কিছুটা শুদ্ধি এসেছিল। কিন্তু তা বেশি সময় স্থায়িত্ব পায়নি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ঘোষণার পরপরই রাত ১২টা থেকে দেশি-বিদেশী গণমাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খবরটি প্রচার করতে থাকে। দেশ ও বিদেশের অসংখ্য নারী-পুরুষ বেদনাহত হন, যাদের কাছে গোলাম আযম ছিলেন তাদের জীবনের চাইতেও বেশি প্রিয়। অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন, কেউবা লুটিয়ে পড়েন সিজদায়, আল্লাহর দরবারে তাঁর উচ্চ মর্যাদা কামনা করে অনেকেই নফল রোজা রাখেন। রাত ১২্টার পর থেকে সময়ের গতি যেন স্তব্দ হয়ে যায়। বেদনার সাথে যোগ হয়েছিল উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। কারণ অজানা আশংকা, ভাষা সৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযমের দাফন-কাফন নিয়ে আবার কোন্ ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে ইসলামী বিদ্বেষী সরকার ও তার দোসররা। তার কিছু আলামতও টের পাওয়া যাচ্ছিল যেমন- তাঁর ইন্তেকালের খবর প্রচারে হাসপাতাল কতৃপক্ষের গড়িমসি, তাঁর পোস্টমর্টেম না করে পরিবারের কাছে হস্তান্তরে আবেদন প্রত্যাখ্যান এবং বিভিন্ন সূত্রে প্রচার হতে থাকে তাঁকে দাফনের জন্য ঢাকার পরিবর্তে তাঁর গ্রামের বাড়ি বি.বাড়িয়ার নবীনগরে নিয়ে যাওয়া হবে ইত্যাদি। একদিকে কিছু মিডিয়ার বিভ্রান্তিকর খবর প্রচার, অন্যদিকে অধ্যাপক গোলাম আযমের মৃত্যুর খবর শুনে হাসপাতালে ভিড় করা জনতাকে সরকারী পেটোয়া বাহিনী কর্তৃক বাঁধা প্রদান এবং গভীর রাতে তাঁর লাশ পোস্টমর্টেমের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো এসবই ছিল স্পর্শ কাতর বিষয়।

হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তার, পরিবারের সদস্যবর্গ ও মাঠে থাকা দায়িত্বশীল ভাইদের সাথে যোগাযোগ রেখে তাদের বিভিন্ন সহযোগিতা প্রদান ও বিভিন্ন দোয়া-দরুদ পড়ে সারা রাত জেগে অতিবাহিত করলাম। ফজরেরর নামাজ সেরে যখন পরবর্তী করণীয় নিয়ে ভাবছিলাম, ঠিক তখনি সম্মানিত সিটি আমীর মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ফোন করে জানালেন, আমাকে আহবায়ক করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট জানাযা বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যগণ হলেন- সর্ব জনাব মোবারক হোসাইন, ডা.রেদওয়ান উল্লাহ শাহেদী, এডভোকেট মশিউল আলম ও ড.রেজাউল করিম। সম্মানিত সিটি আমীর পরামর্শ দিলেন আমি যাতে বিলম্ব না করে স্যারের বাসায় চলে যাই এবং সেখানেই যেন কমিটির বৈঠক আহবান করে করণীয় ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। তাঁর সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ জেনে কালবিলম্ব না করে জামায়াতে ইসলামীর সদস্য জাহিদুর রহমান ভাইকে সাথে নিয়ে খুব দ্রুতই বাসায় পৌঁছে যাই। গাড়িতে বসেই কমিটির সদস্যদেরকে স্যারের বাসায় দ্রুত আসার জন্য অনুরোধ জানাই। আমরা বাসায় পৌঁছার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই স্যারের চতুর্থ ছেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আমান আল আযমী পোস্টমর্টেম শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাতাল থেকে কফিন নিয়ে বাসায় পৌঁছেন। সে সময় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্যারের পরিবারবর্গ, আত্নীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি ও কফিনের সাথে আসা শত-শত জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মী, সমর্থক শুভাকাঙ্খী যারা সারা রাত জেগে পিজি হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জীবন বাজি রেখে তাদের প্রিয় নেতার কফিনকে পাহাড়া দিয়েছেন সকলেই একনজর প্রিয় নেতার মুখ দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের এই প্রাণপুরুষের পবিত্র চেহারা মোবারক দেখে আমরা উপস্থিত সকলেই ডুকরে কেঁদে উঠি। উপস্থিত সকলকে সাথে নিয়ে আমাদের এই প্রিয় অভিভাবকের রেখে যাওয়া ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্ব পালনে সাহায্য, সফলতা ও তাঁর উচ্চ মর্যাদা কামনা করে মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে ফরিয়াদ জানাই। একটি দৃশ্য স্মরণে আসলে তাৎক্ষণিকভাবে আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়ি। সেটি হলো ২০১২ সালের ১১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে আদালতে হাজির হওয়ার সিদ্ধান্ত হলে সেদিনও বাসা থেকে আদালতে পৌঁছানোর দায়িত্ব পালনের জন্য এরকম এক সকালে তাঁর বাসায় হাজির হয়েছিলাম। সেখানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, সর্ব জনাব ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, এডভোকেট মশিউল আলম, এডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক, এডভোকেট কামাল উদ্দিনসহ অনেকে। গোলাম আযম ট্রাইব্যুনালে হাজির হচ্ছেন, তাঁকে কারাগারেও যেতে হতে পারে। দেশ-বিদেশের সংবাদ কর্মীরা সহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যদের সমস্ত রাজধানী জুড়ে ব্যাপক তৎপরতা, উত্তাপ-উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে দেশ এবং দেশের বাইরে। এমনকি তাঁর বাসভবনকে ঘিরে মিডিয়া কর্মীদের উপচে পড়া উপস্থিতি সহ বাইরে ছিল ব্যাপক উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। কিন্তু অধ্যাপক গোলাম আযমের বাসভবনে ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের সিপাহসালার অধ্যাপক গোলাম আযম সহ তাঁর পরিবারবর্গের মধ্যে ছিলনা কোন উদ্বেগ-উৎকন্ঠা কিংবা হতাশার ছাপ। তাঁকে ঘিরে সকলে মিলে এমনভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, মনে হচ্ছিল অধ্যাপক গোলাম আযমের নেতৃত্বে তাঁরা কোন ঈদ উৎসব বা অন্য কোন সামাজিক উৎসবে মিলিত হতে যাচ্ছেন।

সত্যিই এ দৃশ্য প্রেরণাদায়ক। ইসলামী আন্দোলনের বীর সেনানী শুধুমাত্র অন্যদেরকে ইসলামী আদর্শের দিকে মোটিভেশন চালাননি বরঞ্চ নিজেকে আদর্শের মডেল হিসেবে উপস্থাপন ও পরিবারবর্গকেও আদর্শের ছাঁচে ঢেলে সাজিয়েছেন।

সেদিন মর্দে মুজাহিদ জীবন্ত অধ্যাপক গোলাম আযমকে মিছিল সহকারে সাঁজ-সাঁজ রবে আমরা ট্রাইব্যুনালের সামনে হাজির করেছিলাম। দেশ ও বিদেশের সচেতন মানুষ সহ অনেকে আশা করেছিলেন বাংলাদেশ ও বিশ্বে গঠনমুলক রাজনীতিতে তাঁর অবদান ও বয়স বিবেচনায় এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদকে কারাগারে না পাঠিয়ে জামিন প্রদান করে তাঁকে বাসায় ফেরত পাঠানো হবে কিংবা কমপক্ষে তাঁর বাসভবনে অন্তরিন করে রাখা হবে। কিন্তু তা না করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হলো। এবং দীর্ঘদিন ধরে এই বয়োঃবৃদ্ধ নেতাকে পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলে আটকিয়ে রেখে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা-গাজাখুরী গল্প সাজিয়ে ট্রাইব্যুনাল থেকে ন্যায়ভ্রষ্ট ৯০ বছরের কারাদন্ড আদায় করা হয়। যে নেতা ভাষার অধিকার আদায়, বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও সৈ¦রাচারবিরোধী আন্দোলন ও গণমানুষের অধিকার আদায়ে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে গিয়ে একাধিকবার কারাবরণ করেছিলেন, বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন পদ্ধতি চালু করার লক্ষ্যে কেয়ারটেকার সরকারের রূপরেখা প্রণয়ন করে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, দুর্ভাগ্য এই জাতির জন্য, তিনি তো তাঁর কর্মের যোগ্য পুরষ্কার পেলেন-ই- না বরঞ্চ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে মিথ্যা মামলায় দন্ডিত হয়ে কারাগারের সেলে নি:সঙ্গ জীবনে অবহেলা অনাদর আর নিষ্ঠুর মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে জীবনের শেষ নি:শ্বাষ ত্যাগ করলেন। তাঁকে যেমন করে মিছিল সহকারে আমরা মহামান্য আদালতে নিয়ে গিয়েছিলাম ঠিক তেমনি মিছিল সহকারেই তাঁর বাসভবনে ফিরে আসলেন। কিন্তু আমরা যেমনটি তাঁকে জীবন্ত পৌঁছে দিয়েছিলাম, সেই জীবন্ত গোলাম আযমকে আর ফেরত পেলাম না। যারা অমানসিক জুলুম ও শাস্তির মাধ্যমে কষ্ট দিয়ে তাঁকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়েছে তাদের বিচারের ভার মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছেই অর্পন করলাম।

আমাদের যে ৫জনের উপর জানাযা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল আমরা বৈঠকে মিলিত হলাম অধ্যাপক গোলাম আযমের সেই রুমেই যেখানে বসে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ দিতেন। এই সেই রুম যেখানে জীবনে অসংখ্যবার এই মহান নেতার সাথে সাক্ষাৎ করেছি। বিশেষ করে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃস্থানীয়দেরকে নিয়ে তাঁর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত পাঠচক্র আজো স্মৃতির পাতায় অম্লান। তিনি ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন সহ যেকোন বিষয়ের উপর কত যে গভীরে পৌঁছতে পারতেন সেটি অচিন্তনীয়। বৈঠকে যদিও ৫জন বসে ছিলাম কিন্তু সময়ে-সময়ে বৈঠকের কলেবর কেবলই বৃদ্ধি হতে থাকে। বৈঠকের বিভিন্ন পর্যায়ে যেসব সম্মানিত নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, কেন্দ্রিয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা এটিএম মাসুম, অধ্যাপক তাসনিম আলম, ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, কেন্দ্রিয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ, মুহাম্মদ আব্দুর রব, এডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার, মাওলানা যাইনুল আবেদীন, আমিনুল ইসলাম, মতিউর রহমান আকন্দ, মঞ্জুরুল ইসলাম ভূঁইয়া, কেন্দ্রিয় মজলিসে শুরা সদস্য অধ্যাপক সাইফুল্লাহ মানসুর, জনাব মজিবুর রহমান মঞ্জু ও লন্ডন প্রবাসী সাবেক ছাত্রনেতা আব্দুদ্দাইয়ান মোহাম্মদ ইউনুস প্রমুখ। মহান আল্লাহ তায়ালার বিশেষভাবে শুকরিয়া আদায় করছি এক বিশেষ সংকটময় মুহুর্তে ইসলামী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ অধ্যাপক গোলাম আযমের জানাযা নিয়ে সরকার ও তাঁর মদদপুষ্ট ইসলামী বিদ্বেষী শক্তি যখন ঘোষনা দিয়ে জানাযা বাঁধাগ্রস্থ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল, এমনই একটা পরিস্থিতিতে ইসলামী আন্দোলনের এক ঝাঁক প্রবীণ ও নবীন দায়িত্বশীলদের সমাবেশ ঘটিয়ে উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমাদের কমিটির কাজকে সহজ করে দিয়েছিলেন। যদিও আমরা পরামর্শ করে বিভিন্ন বিষয়ে একমত হওয়ার চেষ্টা করেছি, তারপরও সম্মানিত সিটি আমীর মাওলানা রফিকুল ইসলাম খানের সাথে পরামর্শ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্মানিত ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানকে শুনিয়ে তাঁর অনুমোদন নিয়ে বৈঠকে ফাইনাল করেছি। কমিটির আলোচনার বিষয়বস্তুর মধ্যে অন্যতম জানাযার স্থান নির্ধারণ, সুষ্ঠুভাবে জানাযা ও দাফন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে করণীয় নির্ধারণ করা। পরিবার সহ সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে সার্বিক আলোচনা শেষে জানাযা জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে পড়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। সেই মোতাবেক মরহুমের চতুর্থ ছেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আল আযমী প্রেসকে ব্রিফিং করেন এবং তিনি এটাও জানিয়ে দেন, জানাযা ২৫ অক্টোবর ২০১৪ রোজ শনিবার বাদ যোহর বায়তুল মোকাররম মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে। সারাদিন অধ্যাপক গোলাম আযমকে শেষবারের মতো এক নজর দেখতে হাজারো-হাজারো মানুষ তাঁর বাসভবনে আসতে থাকে। যার মধ্যে সাংবাদিক, কবি-সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, আলেম-ওলামা, রাজনীতিবিদ, মরহুমের শুভাকাঙ্খী, পাড়া-প্রতিবেশি, আতœীয়-স্বজন সহ তাঁর রেখে যাওয়া প্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের অসংখ্য নেতা-কর্মীও রয়েছেন। পুরো একদিন একরাত এবং পরেরদিন সকাল ১১টা পর্যন্ত মরহুমের কফিন সাধারণ দর্শনার্থীদের দেখার সুবিধার্থে ফ্রিজআপ এ্যাম্বুল্যান্সে তাঁর বাসভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোরে এবং বাসভবনের সামনের রাস্তায় রাখা হয়। নামাযের সময় বাদ দিয়ে উপরোক্ত সময়ের পুরোটাই দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হলেও একটি মুহুর্তের জন্যও তাঁর বাসভবন এলাকার ভীড় কমেনি। বরঞ্চ এটি তাঁর বাসভবন এলাকা ছাড়িয়ে জানাযার দিন সকাল বেলা জনতার পদভাড়ে বৃহত্তর মগবাজার এলাকা অনেকটা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। জনচাপে প্রশাসনকে মগবাজারের বিভিন্ন রাস্তাগুলোকে বন্ধ রাখতে হয়।

২৫ অক্টোবর ২০১৪ সকাল ১০.৩০টা। আমরা বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের নন্দিত নেতা অধ্যাপক গোলাম আযমের কফিন নিয়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিব, ঠিক তখনি খবর আসলো কয়েকটি ভূইফূঁড় সংগঠন বর্তমান সরকারের মদদে প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়েছে। তারা ঘোষনা দিয়েছে যেকোন মূল্যে অধ্যাপক গোলাম আযমের নামাজে জানাযা বায়তুল মোকাররমে প্রতিহত করবে। ঠিক তাঁর কিছুক্ষণ পরেই দৈনিক বাংলা মোড়ের কাছ থেকে জাতীয় ক্রিড়া ভবনের সামনে থেকে উপুর্যপুরী ১৫-২০টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সুতরাং সেই সময়ের উদ্ভুত পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয়। তাৎক্ষণিকভাবে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য উপস্থিত নেতৃবৃন্দ সহ বৈঠকে বসা হলো। সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা শেষে আমরা সিদ্ধান্তে উপনীতি হলাম পরিস্থিতি যাই হোক না কোন জানাযা ইনশাল্লাহ বায়তুল মোকাররমেই অনুষ্ঠিত হবে। সেই মোতাবেক বায়তুল মোকাররম সহ বিভিন্ন জায়গায় স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালনরত দায়িত্বশীলদের প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেওয়া হলো। বেলা তখন ১১.১৫মিনিট। আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করে জানাযার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়ার জন্য বাসভবনের সামনের রাস্তায় নেমে এলাম। সেখানে রিকসার উপর দাঁড়িয়ে হ্যান্ড মাইকে বাসভবন প্রাঙ্গনে আগত জনতার উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখা হলো। কফিনবাহি গাড়িকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য সামনে পিছনে পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রাইভেট ট্রাক ও মোটরবাইক দিয়ে শুভাযাত্রার মতো সজ্জিত করা হলো। শুরু হলো কফিনবাহী কালেমার মিছিলের শুভাযাত্রা। জনতার ভিড়ে এক পা সামনে এগুতে পারলেও মনে হচ্ছিল যেন দু’পা পিছিয়ে যাচ্ছে। যতদূর চোখ যায় সামনে-পিছনে, ডানে-বামে, বিল্ডিংয়ের ছাদের উপরে, ফুটপাতে শুধু মানুষ আর মানুষ। কেউবা কালেমার মিছিলে শামিল আছেন কেউবা অনেকেই রাস্তায়-রাস্তায় মিছিলে শরিক হচ্ছেন আর অসংখ্য মানুষ রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে কালেমার মিছিলকে স্বাগত জানাচ্ছেন। মগবাজার থেকে বায়তুল মোকাররম দীর্ঘ রাস্তায় একটিই আওয়াজ ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল- ‘আশহাদু লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয় আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু’। কয়েক ঘন্টার জন্য ব্যস্ত ঢাকা মহানগরী কালেমার মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়ে যায়। এ এক অভাবনীয় দৃশ্য যা যারা প্রত্যক্ষ করেছেন তারাই শুধু বুজতে পারবেন। অনুপস্থিতদের বুঝানোর জন্য ভাষার যত বিশেষণই ব্যবহার করা হোক না কেন প্রকৃত দৃশ্য উপলব্ধি করানো কখনোই সম্ভব নয়। আমার চোখ দিয়ে বারবার পানি আসছিল। একবার আকাশের পানে তাকাচ্ছি আর একবার মিছিলের দৃশ্য অবলোকন করছি আর অন্যদিকে সতর্ক থাকার চেষ্টা করছি দুশমনদের চক্রান্ত ষড়যন্ত্র সম্পর্কে। কালেমার মিছিল যখন কাকরাইল মোড় অতিক্রম করছিল তখনই খবর আসলো পল্টন মোড়ে হাতে গুনা কয়েকজন দুষ্কৃতিকারী বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছে এবং তারা কফিনের উপর হামলা করতে পারে। এ খবর শুনার সাথে সাথে প্রিয় নেতার কফিনবাহী এ্যাম্বুল্যান্সকে ঘিরে নতুন করে সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো। তারপর আল্লাহর উপর ভরসা করে জনতার মিছিল সামনে এগুতে থাকলো। পল্টন মোড় অতিক্রমকালে চোখে পড়লো হাতে গুনা ঐ কয়েকজন দুষ্কৃতিকারীকে জনতা আটক করে হালকা-পাতলা মেহমানদারী করছে। বুঝা গেল দুষ্কৃতিকারীদের পিছনে যতই রাষ্ট্রীয় মদদ থাকুক না কেন তাদের নৈতিক মনোবল দূর্বল। ফলে অনেক ইনভেস্ট করেও হাজারো চেষ্টার মাধ্যমে তেমন কোন দুষ্কৃতিকারী জড় করতে পারেনি। আমার ধারণা তারা হয়তো আশেপাশে ছিল কিন্তু তৌহিদবাদী জনতার বিশাল মিছিলের সামনে তারা বাস্তবে ভুদভুদের শুন্যে বিলীন হয়ে যায়।

মহান আল্লাহ তায়ালার অপার রহমতে কফিন নিয়ে আমরা বায়তুল মোকাররমে পৌঁছতে সক্ষম হই। সালাতুয যোহরের শেষে জানাযার পূর্ব মুহুর্তে তাঁরই যোগ্য উত্তরসূরী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আল আযমী জনতার উদ্দেশ্যে এক হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য প্রদান করেন। বক্তব্যে তিনি বলেন, “লাখ লাখ জনতার উপস্থিতি প্রমাণ করে এই দেশে একদিন ইসলামের পতাকা উড্ডীন হবেই। অধ্যাপক গোলাম আযম একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ ছিলেন। তাঁর নামাযে জানাযায় অংশ নেয়ার জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষ এসেছে। আমি সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। আমার বাবা ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে দুনিয়া থেকে চলে গেলেন। তিনি মিথ্যা মামলায় ১০১৬ দিন কারাবন্দী ছিলেন। প্রতিটি দিন ছিল তাঁর জন্য, আমাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তাঁর শেষ দিনগুলো কেঁটেছে বেদনাদায়কভাবে। এটা ভুলবার নয়। আব্দুল্লাহিল আমান আল আযমী বলেন, তিনি ছিলেন ইসলামপ্রিয় জনতার নয়নের মনি, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সিপাহসালার। তাঁর একটাই উদ্দেশ্য ছিল দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করা। আপনারা আল্লাহকে ভালোবাসেন, আল্লাহর রাসূল (সা:)-কে ভালোবাসেন। এই কারণে এই আন্দোলনের সিপাহসালার হিসেবে অধ্যাপক গোলাম আযমকে ভালোবাসার জন্যই আপনারা এখানে এসেছেন। তাঁর ইন্তিকালের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনের কাজ শেষ হয়ে যাবে না, এই জমিনে ইসলামের শিকড় অনেক গভীরে। লাখ লাখ জনতার এই উপস্থিতি প্রমাণ করে এই দেশে একদিন ইসলামের পতাকা উড্ডীন হবেই। তিনি ছিলেন নৈতিক চরিত্র ও আদর্শের মূর্ত প্রতীক। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দেশের আনাচে কানাচে ছুটে বেড়িয়েছেন। আমি নিশ্চিত জ্ঞানত তিনি কাউকে দুঃখ দেয়ার জন্য কিছু করেননি। অজ্ঞাতসারে তিনি কাউকে দুঃখ দিয়ে থাকলে আপনারা মাফ করে দিবেন। তাঁর কথা, আচরণ ও কর্মে কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে থাকলে আপনারা মাফ করে দিবেন। মরহুমের সঠিক মূল্যায়ন হবে, যে দ্বীন বিজয়ী করার জন্য তিনি চেষ্টা করে গেছেন, সে দ্বীন বিজয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে। আমি আশাবাদী অবশ্যই বিজয়ী হবে।”

জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “মরহুমের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম আজীবন স্বপ্ন দেখে গেছেন এমন একটি রাষ্ট্রের, যেখানে সরকার নামাজ প্রতিষ্ঠিত করবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায় করা হবে, ভালো কাজের আদেশ দেয়া হবে আর অন্যায় কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে রকম রাষ্ট্র হয়নি। যতদিন পর্যন্ত তা না হবে, যতদিন পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন পর্যন্ত আমরা আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবো। তিনি আরো বলেন, মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম ছিলেন পূর্ণাঙ্গ ঈমানদার, বিশ্বব্যাপী পরিচিত একজন ব্যক্তিত্ব। সারা দুনিয়াব্যাপী তার গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।” এ সময় তিনি মরহুমের জন্য দোয়া পাঠ করলে সকলে সমস্বরে ‘আমিন’, ‘আমিন’ বলে উঠেন।

বক্তব্য শেষে মরহুমের নামাজে জানাযার ইমামতি করেন তাঁর চতুর্থ ছেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আল আযমী। শত বাঁধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে মাত্র অল্প সময়ের ঘোষনায় লক্ষ-লক্ষ জনতার সমাগম ঘটে। নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পূর্বেই বায়তুল মোকাররম উত্তর এবং দক্ষিণ গেট ও তার চার পাশ, পল্টন ময়দান, গুলিস্তান, জিপিও, দৈনিক বাংলার মোড় হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত জনসমুদ্রে পরিণত হয়। জানাযার পূর্ব মুহূর্তে জনগণ ‘নারায়ে তাকবীর-আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি ও উচ্চস্বরে কালেমা পাঠ করতে করতে চারদিক মুখরিত করে তোলে। জানাযাকে ঘিরে বায়তুল মোকাররম ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। সরকার সমর্থক কয়েকটি সংগঠন জানাযা ঠেকানোর ঘোষণা দিলেও বিপুল সংখ্যক জনতার উপস্থিতি টের পেয়ে উপুর্যুপরী ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ফলে শান্তিপূর্ণভাবেই বাদ জোহর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযমের নামাযে জানাযা সম্পন্ন হয়। নামায শেষে মগবাজারস্থ কাজী অফিস লেনস্থ নিজ বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে এই কিংবদন্তি নেতাকে দাফন করা হয়।

উল্লেখ্য যে, একি দিন সারাদেশে প্রতিটি জেলা, মহানগরী ও থানা সদর সহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযা শেষে আবার একিভাবে কফিন সহকারে কালেমার মিছিল বায়তুল মোকাররম থেকে মগবাজার কাজী অফিস লেনস্ত তাঁর বাসভবনে ফিরে আসেন। এবার মিছিলের বিস্তৃতি হয় আরো এবং বিশাল। কফিনবাহী জনতার অগ্রভাগ যখন কাজী অফিস লেনের পারিবারিক কবরস্থানে পৌঁছে গেছে তখনও জনতার পিছনের অংশ কাকরাইলে ছিল। অবশেষে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে অসংখ্য মানুষের আহাজারির মধ্য দিয়ে বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ কিংবদন্তি অধ্যাপক গোলাম আযমকে সমাহিত করা হলো তাঁর শেষ অসিহত অনুযায়ী পারিবারিক কবরস্থানে। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁকে আ’লা মাকানে স্থান দিন এবং তাঁর রেখে যাওয়া ইসলামী আন্দোলনকে চূড়ান্ত বিজয় “ফতাহুন কারীব” দান করুন। আমীন।

লেখকঃ কেন্দ্রিয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।